ইতিকাফের ফাযায়েল ও মাসায়েল

ইতিকাফের ফাযায়েল ও মাসায়েল

ইতিকাফের ফাযায়েল ও মাসায়েল
– মুফতি জসিমুদ্দীন (হাফি.)
——————————
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
‘যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্যে সম্মেলনস্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্যে পবিত্র রাখো। (সূরা বাকারা : ১২৫)

ইতিকাফের পরিচয় ও ফযীলত
—————–
ইতিকাফ অর্থ, কোনো স্থানে নিজেকে আবদ্ধ করা। শরীয়তের পরিভাষায়, বিশেষ সময় ও নিয়মে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখা। অর্থাৎ যে সকল প্রয়োজনীয় কাজ মসজিদে সম্পাদন করা সম্ভব নয় যেমন পেশাব, পায়খানা, ওয়াজিব গোসল ইত্যাদি, এ সকল প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোনো কাজে মসজিদ থেকে বের না হয়ে, রমযান মাসের ২০ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত, পুরুষদের জন্য মসজিদে এবং মেয়েদের জন্য নিজ ঘরের নির্ধারিত নামাযের স্থানে, পাবন্দীর সাথে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে।

ইতিকাফ মানুষকে দুনিয়ার ঝামেলা ত্যাগ করার অভ্যাস শিক্ষা দেয়, অল্প কাজের জন্যে হলেও আল্লাহর সাথে তার সর্ম্পক জুড়িয়ে দেয়। এতে মানুষের জন্যে অন্তিমকালে দুনিয়া ত্যাগ করা সহজ হয় এবং দুনিয়ার মহাব্বতের স্থলে আল্লাহর মহাব্বত বৃদ্ধি পায়। ইতিকাফকারীর উদাহরণ হচ্ছে সেই মুখাপেক্ষী ব্যক্তির মত যে কোনো মহান ব্যক্তির দরবারে হাত পেতে বলে, যে পর্যন্ত না আমার হাজত পূর্ণ হয় আমি এই দরবার ত্যাগ করব না।

হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে তিন খন্দক দূরে রাখবেন। প্রত্যেক খন্দকের দূরত্ব আসমান-যমীনের দূরত্বের চেয়েও বেশি। (তাবারানী ; বায়হাকী)
রাসূলে কারীম স. নিয়মিত ইতিকাফ করতেন। হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত-
أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعتكف العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله ثم اعتكف أزواجه من بعده
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বছর রমাযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন এমনকি তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর তার সম্মানিত স্ত্রীগণ ইতিকাফ করতেন। (ছহীহ বুখারী: হাদীস নং ২২২৬)

ইতিকাফের প্রকারভেদ
—————
ইতিকাফ তিন প্রকার। ক. ওয়াজিব, খ. সুন্নাত, গ. মুস্তাহাব।
ক. ইতিকাফ করার জন্যে মান্নত করলে বা সুন্নাত ইতিকাফ বিনা-কারণে ভেঙ্গে ফেললে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব। মান্নত দু’ধরনের হতে পারে।
ক. সাধারণ মান্নত।
খ. শর্তের সাথে সম্পর্কিত মান্নত।

সাধারণ মান্নত, যেমন কেউ বলল, ‘আমি অমুক তারিখে ইতিকাফ করার মান্নত করলাম।’ আর শর্তের সাথে সম্পর্কিত মান্নত, যেমন কেউ বলল, ‘আমার অমুক কাজ পূর্ণ হলে আল্লাহ তা’আলার জন্যে ইতিকাফ করবো।’ আর মান্নত সঠিক হওয়ার জন্যে মুখে মান্নতের কথা উচ্চারণ করা জরুরি। কেবল মনে মনে নিয়ত করার দ্বারা মান্নত সঠিক হয় না।

মান্নতের ইতিকাফ সঠিক হওয়ার জন্যে রোযা রাখা শর্ত। এমনকি কেউ যদি মান্নত করে যে, রোযা রাখা ব্যতীত আমি দশদিন ইতিকাফ করবো, তবুও ইতিকাফ আদায়কালে রোযা রাখতে হবে। ওয়াজিব ইতিকাফের হুকুম হলো, নিজের উপর থেকে ওয়াজিব আদায় হয় এবং সাওয়াব লাভ হয়।

খ. রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদা। আমাদের ফকীহগণ এ ইতিকাফকে ‘সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া’ বলেছেন। অর্থাৎ মসজিদের অধিবাসীদের মধ্যে কেউ ইতিকাফ করলে সকলে গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। আর কেউ আমল না করলে সকলে গুনাহগার হবে।

সুন্নাত ইতিকাফ রমযানের দশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ এবং রমাযানের শেষ তারিখে সূর্যাস্তের পর মসজিদ হতে বের হতে হয়। মসজিদে চুপ করে বসে না থেকে নফল নামায, কুরআন তেলাওয়াত বা আল্লাহর যিকির করা উচিত। পাঞ্জেগানা মসজিদ যেখানে নিয়মিত জামাত হয় সেখানে ইতিকাফ করা জায়েয। তবে জুমার মসজিদে ইতিকাফ করা উত্তম। মহিলারা আপন ঘরে একটি স্থান নির্দিষ্ট করে সেখাানে ইতিকাফ করবে।

গ. ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফ ছাড়া বাকী সকল ইতিকাফ মুস্তাহাব। মুস্তাহাব ইতিকাফ স্বল্প সময়ের জন্যেও হতে পারে।

ইতিকাফের শর্তাবলী
——————-
১. নিয়ত করা। নিয়ত ব্যতীত ইতিকাফ সহীহ হবে না।
২. পুরুষের জন্যে এমন মসজিদ হতে হবে যেখানে জামাতের সাথে নামায আদায় করা হয়। তবে নফল ইতিকাফ যেকোনো মসজিদে হতে পারে। আর মহিলারা নিজেদের ঘরের নামায আদায়ের স্থানে ইতিকাফ করবে, তারা প্রয়োজন ব্যতীত সে স্থান থেকে বের হবে না।

৩. রোযা রাখা। তবে নফল ইতিকাফের জন্যে রোজা রাখা শর্ত নয়।
৪. মুসলমান হওয়া। কেননা কোনো অমুসলিম ব্যক্তি ইবাদতের যোগ্যতা রাখে না।
৫. জ্ঞানবান বা বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া।
৬. জানাবাত, হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া। কেননা নাপাকী অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ। স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ইতিকাফ করবে না। আর যদি স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ইতিকাফের মান্নত করে তাহলে স্বামীর অধিকার আছে স্ত্রীকে ইতিকাফ থেকে বিরত রাখার।

উল্লেখ্য, ইতিকাফ সহীহ হওয়ার জন্য বালেগ হওয়া শর্ত নয়। কেননা বিবেকবান ছোট শিশুর ইতিকাফও সহীহ। অনুরূপভাবে ইতিকাফ সহীহ হওয়া জন্যে আযাদ হওয়া শর্ত নয়; বরং গোলাম বা দাস-দাসীর ইতিকাফও সহীহ, মালিকের অনুমতিক্রমে।

ইতিকাফের আদবসমূহ
————————
যিকির, নফল নামায ও তিলাওয়াতে মগ্ন থাকা। এমনিভাবে হাদীস পাঠ, ইলম চর্চা, দ্বীনের দাওয়াত দেয়া, ঈমানী আলোচনা, নবী, সাহাবী ও আওলিয়াদের জীবনী পাঠে নিজেকে ব্যস্ত রাখা উত্তম। অনর্থক কথা ও খোশগল্পে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। সকল অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা। ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা, বেচাকেনা করা আদব পরিপন্থী, না করাই শ্রেয়। তবে অতি প্রয়োজনীতার ক্ষেত্রে অবকাশ আছে। ইতিকাফ অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে তায়াম্মুম করে মসজিদের আদব রক্ষা রেখে অতি তাড়াতাড়ি গোসল করে মসজিদে ফিরে আসবে। আর এই স্বপ্নদোষের কারণে ইতিকাফ ও রোযার কোনো ক্ষতি হবে না।

ইতিকাফ সম্পর্কিত কয়েকটি মাসআলা
————————-
মাসআলা: রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। বড় শহরে প্রতিটি মহল্লার একজন এবং ছোট গ্রামে প্রতি পাড়া থেকে একজন করে ইতিকাফ না করলে এলাকার সকল লোক সুন্নাত পরিহার করার জন্যে দায়ী হবে। আর যদি মহল্লা বা পাড়া থেকে একজন ব্যক্তি ইতিকাফ পালন করে, তাহলে সকলের পক্ষ থেকে সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।

মাসআলা: ইতিকাফকারীর জন্যে একেবারে নীরব থাকা আবশ্যক নয়, বরং এটা মাকরুহ। তবে কারো সমালোচনা করা এবং ঝগড়া-বিবাদ ও অহেতুক গল্প-গুজব থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

মাসআলা: ইতিকাফকালে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই। নামায পড়া, তিলাওয়াত করা, ধর্র্মীয় গ্রন্থাদি পাঠ করাসহ অন্য যে কোন ইবাদত করা যাবে।
মাসআলা : যে মসজিদে ইতিকাফে বসা হয় তা জামে মসজিদ না হলে, জুমার দিন জুমার নামাযের জন্যে (অনুমান করে উক্ত মসজিদ থেকে) এতটুকো সময় নিয়ে বের হতে হবে, যাতে জুমা মসজিদে পৌঁছে সুন্নাত আদায় করে খুতবা শুনা যায়। জুমা মসজিদে কিছু সময় বেশি লেগে গেলেও ইতিকাফের কোনো ক্ষতি হবে না।

মাসআলা: প্রাকৃতিক অথবা শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত স্বল্প সময়ে জন্যে মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। চাই তা ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলক্রমে। এ অবস্থায় ইতিকাফ কাযা করা ওয়াজিব।

মাসআলা : রমযানের শেষ দশদিনের ইতিকাফ করতে হলে ২০ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্বেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। এবং ঈদের চাঁদ দেখার পর মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে।

মাসআলা : ইতিকাফকারীর জন্যে জুমার দিন গোসল করা অথবা শুধু শীতলতা বা প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে গোসলের জন্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয নেই।

মাসআলা : এমনিভাবে জানাযার নামাযে শরীক হওয়া, অসুস্থ-রুগী দেখতে যাওয়া, পানাহার করা, নিদ্রা যাওয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বের হলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

মাসআলা: ইতিকাফকারী ভুল করে যদি মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়। তবুও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। ইতিকাফকারী যদি ভুল করে বিনা ওযরে মসজিদ থেকে অল্প সময়ের জন্যে বের হয়, অযথা ঘোরাফেরা না করলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

মাসআলা : শরয়ী প্রয়োজনে ইতিকাফকারী মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। যেমন, জুমার জন্যে এবং নির্ধারিত মুয়াযযিনের উপস্থিতেও আযান দেয়ার জন্যে বের হওয়া।

মাসআলা: নফল ইতিকাফের কাযা করা ওয়াজিব নয়। কেননা নফল ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার ফলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয় না, বরং তা নিঃশেষ হয়ে যায়।

মাসআলা: কোনো ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট অথবা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ইতিকাফের মান্নত করে এবং তার কোনো এক সময়ের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়। তাহলে নতুনভাবে আবার পূর্ণ ইতিকাফ করা ওয়াজিব। কারণ মান্নতের ইতিকাফে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে রমযানের শেষ দশকের সুন্নাত ইতিকাফের মধ্যে যদি কোনো এক দিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়। তাহলে শুধু ঐ দিনের ইতিকাফ কাযা করা ওয়াজিব। তবে পূর্ণ দশদিনের ইতিকাফ কাযা করা উত্তম। ঐ দিনের কাযা রমাযানেও করতে পারবে বা রমাযানের বাইরে করতে পারবে। রমাযানের বাইরে হলে নফল রোযার সাথে আদায় করতে হবে। রমজানের এ ইতিকাফ ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে তা নফলে পরিণত হয়ে যায়।

মাসআলা : ইতিকাফকারী মসজিদের অভ্যন্তরে নিজের শরীরে দূষিত রক্ত নিজেই বের করতে পারবে। যে রক্ত বের করার কাজ করে সে যদি পারিশ্রমিক ব্যতীত কাজ করে তাহলে মসজিদের ভিতরে জায়েয আছে। কিন্তু যদি পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করে তাহলে ইতিকাফকারী মসজিদের ভিতরে অবস্থান করবে আর সে ব্যক্তি মসজিদের বাহিরে অবস্থান করে রক্ত বের করবে।

মাসআলা : যদি ইতিকাফকারী প্রাকৃতিক প্রয়োজনে (পেশাব-পায়খানা) ইত্যাদির সম্পন্ন করার জন্যে বাইরে যায় এবং টয়লেটে ভিড় থাকে তাহলে বাইরে অপেক্ষা করা জায়েয আছে।

মাসআলা: ইতিকাফকারীর জন্যে মসজিদের এককোণে পর্দা দেওয়া মুস্তাহাব। কারণ এর দ্বারা নিজের সতর হেফাজত করা ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্যে চাটাই দিয়ে পর্দা দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে, এটা বিদআত নয়। কিন্তু ইতিকাফকারীকে অবশ্যই এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা ব্যবহারের কারণে নামাযীদের কোন ধরনের অসুবিধা না হয় এবং কাতার সোজা করতে ব্যঘাত না ঘটে।

মাসআলা: কোনো ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়ে ইতিকাফে বসানো জায়েয নেই। এক্ষেত্রে পারিশ্রমিক দেয়া-নেয়া উভয়টিই অবৈধ।

মাসআলা: প্রাকৃতিক ও শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত অন্যান্য কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

মাসআলা: ইতিকাফের নিয়্যাত ব্যতীত মসজিদের ভিতরে ইফতার করা মাকরূহ। ইতিকাফের নিয়্যাত ব্যতীত মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করলে যখনই স্মরণ হবে তখন নফল ইতিকাফের নিয়ত করে নিলে মসজিদের ভিতর ইফতার করতে পারবে।
ইফতার করতে হৈ-হুল্লুড় এবং চিল্লাচিল্লিতে মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণœ করা এবং মসজিদের বিছানাদি (মুসল্লা) নষ্ট বা এলোমেলো করা মাকরূহে তাহরিমী থেকে মুক্ত নয়।

মাসআলা: ওয়াজিব ইতিকাফের জন্যে রোযা শর্ত। রোযা রাখার নিয়ত না করলেও রোযা রাখতে হবে। এ জন্যে কেউ রাতে ইতিকাফ করার নিয়ত করলে তা অনর্থক মনে করতে হবে। কিন্তু রাত দিন উভয়ের নিয়ত করলে অথবা কয়েক দিনের নিয়ত করলে রাতও শামিল হবে। আর কেবল এক দিনের ইতিকাফের মান্নত করলে তার সাথে রাত যুক্ত হবে না। খাস করে ইতিকাফের জন্যে রোযা রাখা জরুরী নয়। যে উদ্দেশ্যেই রোযা রাখুক না কেন তা ইতিকাফের জন্যে যথেষ্ট হবে। কেউ পুরো রমযান মাস ইতিকাফের মান্নত করলে এবং ঘটনাক্রমে রমাযানের ইতিকাফ করতে না পারলে, এক্ষেত্রে অন্য যে কোনো মাসে ইতিকাফ করলে মান্নত পূর্ণ হবে। কিন্তু একাধারে রোযাসহ ইতিকাফ করা জরুরী হবে।

মাসআলা: সুন্নাত ইতিকাফ তো রমাযান মাসেই হয়ে থাকে। তাই ভিন্ন করে রোযা শর্ত করার প্রয়োজন নেই। তবে কোনো ব্যক্তি সুন্নাত ইতিকাফের সময় রোযা না রাখলে তার ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

মাসআলা : কেউ কেউ মুস্তাহাব ইতিকাফে রোযা শর্তের কথা বললেও; নির্ভরযোগ্য মতে তা শর্ত নয়।
মাসআলা: ওয়াজিব ইতিকাফ অন্ততপক্ষে একদিন হতে হবে। আর সুন্নাত ইতিকাফ দশদিন। মুস্তাহাব ইতিকাফের জন্যে কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। এক মিনিট বা তার থেকে কমও হতে পারে।

মাসআলা: ইতিকাফে দু’ধরনের কাজ হারাম। প্রথম প্রকার: ইতিকাফের স্থান থেকে স্বাভাবিক বা শরয়ী জরুরত ব্যতীত বাইরে বের হওয়া। স্বাভাবিক প্রয়োজন যথা, পেশাব-পায়খানা, ফরয গোসল, খানা আনার লোক না থাকলে খেতে যাওয়া। শরয়ী প্রয়োজন যথা- পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফ বসলে জুমার নামাযে যাওয়া।
দ্বিতীয় প্রকার: যে সব কাজ ইতিকাফ অবস্থায় করা ঠিক নয়। যেমন সহবাস করা। ইচ্ছা করে হোক বা ভুলে। ইতিকাফের কথা ভুলে সহবাস মসজিদে করুক বা বাইরে, সর্বাবস্থায় ইতিকাফ বাতিল হবে। সহবাসের আনুষাঙ্গিক কাজ, যেমন চুমা দেয়া, আলিঙ্গন করা ইতিকাফ অবস্থায় জায়েয নেই। তবে এতে যদি বীর্যপাত না হয়, তবে ইতিকাফ বাতিল হবে না। আর বীর্যপাত হলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু কেবল কল্পনা বা চিন্তার কারণে বীর্যপাত হলে ইতিকাফ বাতিল হবে না।

মাসআলা: সাধারণত যে সমস্যা ও বিপদগুলো সচারাচর দেখা দেয় না, তার জন্যে ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা ইতিকাফ পরিপন্থী। যেমন কোনো রোগী দেখা, কোনো ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে যাওয়া, আগুন নেভাতে যাওয়া কিংবা মসজিদ ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে মসজিদ থেকে বের হওয়া। এ সকল কাজে গুনাহ হবে না; বরং জান বাঁচানোর জন্যে জরুরি। কিন্তু ইতিকাফ বাকী থাকবে না। যদি কেউ কোনো প্রয়োজনে বের হয় এবং প্রয়োজন পূরণের আগে বা পরে রোগী দেখে অথবা জানাযার নামায আদায় করে, তবে তাতে দোষ নেই।

মাসআলা: ইতিকাফ অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে পার্থিব কাজে জড়িত হওয়া মাকরূহে তাহরিমী। যেমন প্রয়োজন ব্যতীত কেনাবেচা করা, ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজ করা। অবশ্য যে কাজ খুবই প্রয়োজন, যেমন ঘরে খাদ্য নেই, সে ছাড়া বিশ^াসী কোনো লোকও নেই. এ অবস্থায় ক্রয়-বিক্রয় জায়েয আছে। মালপত্র মসজিদে আনলে মসজিদ অপরিষ্কার হওয়া কিংবা জায়গা আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে আনা জায়েয হবে না, অন্যথায় কেউ কেউ জায়েয বলেছেন।

ইতিকাফ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণসমূহ
————————–
১. ইচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে সহবাস করা। ইতিকাফের কথা ভুলে গিয়ে মসজিদের ভেতরে সহবাস করুক বা বাইরে। সামনের রাস্তায় হোক বা পিছনের, সর্বাবস্থায় ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

২. সমকামিতার কারণে।
৩. কারো সঙ্গ দেয়ার জন্যে মসজিদ থেকে বের হলে।
৪. নির্দিষ্টভাবে রোগী দেখা বা তার সেবা করা কিংবা জানাযার শরীক হওয়ার জন্যে মসজিদে থেকে বের হলে।

৫. বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদি পান করার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে।
৬. অযুখানায় বিনা ইচ্ছায় অযুর পূর্বে বসে হাত মুখ পরিষ্কার করলে।
৭. অযুর পর অযুখানায় দাড়িয়েই রুমাল বা অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে অযুর পানি মুছতে থাকলে।
৮. খতমে কুরআন শোনা বা শোনানোর জন্যে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে গেলে।

৯. মুয়াযযিন ইতিকাফ অবস্থায় অযুখানা, মসজিদের বাইরের বারান্দা ও মসজিদের টাঙ্কী পরিষ্কার বা তাতে পানি ভর্তি করার জন্যে মসজিদ থেকে বের হলে।
১০. কোনো শিক্ষক, বক্তা বা কর্মকর্তা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হয়ে শিক্ষকতা, বক্তৃতা বা অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজ করলে।

১১. কোনো মুতাকিফের রোযা ভেঙ্গে গেলে তার ইতিকাফও ভেঙ্গে যাবে। চাই রোযা কোনো ওযরের কারণে নষ্ট হোক বা বিনা ওযরে। কেননা ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফ সহীহ হওয়ার জন্যে রোযা রাখা শর্ত।

১২. মাদরাসা, ইমাম ও মুয়াযযিনের রুম কিংবা অযুখানা মসজিদের সীমানার অন্তর্ভূক্ত না হলে ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হয়ে উক্ত স্থানে যাওয়ার কারণে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। এটি ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. এর মত। তবে ঐ স্থানগুলো যদি মসজিদের সীমানার অন্তর্ভূক্ত হয় তাহলে মসজিদের হুকুমে হবে। এমনিভাবে সিঁড়ির বিধানও অনুরূপ। একতলা বিশিষ্ট হোক কিংবা একাধিক।

১৩. মসজিদের নিচ তলায় ইতেকাফকারী যদি দ্বিতীয় তলার মসজিদের সিড়ি বাহির দিয়ে হয়। ঐ সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতীয় তলায় গেলে ইতেকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

১৪. ইতিকাফ অবস্থায় যে সব কাজের জন্যে বের হওয়া বৈধ, তা করার পর প্রয়োজন ব্যতীত সামান্য সময় দেরি করার কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। এটি ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ. এর মত। আর অন্যান্য ইমামদের মতে সামান্য সময়ের দেরিতে ইতিকাফ নষ্ট হবে না।

১৫. পেশাব-পায়খানার জন্যে বের হওয়ার পর যদি কেউ তাকে কিছু সময়ের জন্যে আটক করে রাখে, তাহলে ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ. এর মতে তার ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

যে সব কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয় না
———————–
১. কোনো ওযরের কারণে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া। যেমন, মসজিদ ভেঙ্গে পড়া বা জোরপূর্বক মসজিদ থেকে বের করে দেয়া। এরপর সে অন্য মসজিদে গিয়ে ইতিকাফ শুরু করলে প্রথম ইতিকাফ বাতিল হবে না। অনুরূপভাবে কেউ জান-মালের ভয়ে এক মসজিদ থেকে বের হয়ে অন্য মসজিদে গিয়ে ইতিকাফ করলে তার প্রথম ইতিকাফ নষ্ট হবে না।

২. যদি মুতাকিফের স্বপ্নদোষ হয় এবং ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা তার শরীরের জন্যে ক্ষতিকর হয়, তাহলে সে গরম পানির জন্যে মসজিদে অপেক্ষা করবে না বরং তায়াম্মুম করে মসজিদের বাইরে অপেক্ষা করবে।

৪. ইতিকাফের মান্নত করার সময় যদি রোগী দেখা এবং সেবা করা, জানাযায় এবং ইলমের মজলিসে উপস্থিত হওয়ার শর্ত লাগায়, তবে সে ইতিকাফ অবস্থায় উক্ত কাজগুলোর জন্যে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে।

৫. মাথা পরিষ্কার করার জন্যে মসজিদে বসে মাথা বাইরে বের করলে ইতিকাফ নষ্ট হবে না।

৬. মুতাকিফ আযান দেয়ার জন্যে মসজিদের মিনারায় আরোহণ করলে বা বাইরে গেলে তার ইতিকাফ ভাঙ্গবে না। সে ঐ মসজিদের মুয়াযিযন হোক বা না হোক।
৭. বাসায় খানা আনার জন্যে যাওয়ার পর যদি খানা প্রস্তুত না হওয়ায় সামান্য সময় বিলম্ব করতে হয় তাহলে তা অপেক্ষা করা বৈধ।

যে সব কারণে ইতিকাফ ভেঙ্গে দেয়া জায়েয
————————-
১. যদি জানাযা উপস্থিত হয় আর নামায পড়ানোর কেউ না থাকে, তাহলে মুতাকিফের জন্যে জানাযা পড়ানোর লক্ষ্যে ইতিকাফ ভেঙ্গে দেয়া বৈধ।
২. যদি ইতিকাফ অবস্থায় এমন রোগে আক্রান্ত হয়, যার ঔষধের জন্যে অন্য কেউ না থাকায় মসজিদের বাইরে যেতে হয় তাহলে তার জন্যে ইতিকাফ ভেঙ্গে দেয়া জায়েয।
৩. জিহাদ নফীরে আম হয়ে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে দেয়া জায়েয।

৪. কেউ মুতাকিফকে জোর করে মসজিদ থেকে বের করে নিয়ে গেলে, যেমন সরকারের পক্ষ থেকে ওয়ারেন্ট জারী হওয়া, তার ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
উল্লিখিত কারণগুলোতে ইতিকাফ ভেঙ্গে দিলে তার কোনো গুনাহ হবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে শরীয়ত তাকে অনুমতি দিয়েছে। তবে পরে কাযা করতে হবে।

যে সব কাজ মুতাকিফের জন্যে মসজিদে করা মুবাহ
————————
১. দ্বীনি বা দুনিয়াবী জরুরী কাজকর্ম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা এবং পরিবার-পরিজনকে প্রয়োজনীয় কাজের আদেশ-নিষেধ করা।
২. প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র লেখা।
৩. ডাক্তারের জন্যে ফি ব্যতীত প্রেসক্রিপশন করা ও রোগী দেখা জায়েজ। তবে ফি নিয়ে তা করা নাজায়েজ।

৪. আকদে নিকাহ করা তথা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ ।
৫. কাপড় পরিবর্তন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মাথায় তেল দেয়া এবং দাড়ি ও চুল চিরুনী করা বৈধ ।
৭. মসজিদে চুল ও গোঁফ কাটা জায়েয। তবে শর্ত হলো, নিচে কোনো কিছু বিছিয়ে নেয়া, যেন মসজিদ নোংরা না হয়।

মহিলাদের ইতিকাফের বর্ণনা
———————-
মহিলাদের রমাযানের শেষ দশ দিন এতিকাফ করা সুন্নাত। উপরে উল্লিখিত হযরত আয়েশা রা. এর হাদীসে উম্মুল মুমিনীনের এতিকাফ করার কথা উল্লেখ হয়েছে। যেমন তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর উম্মাহাতুল মুমিনীন ইতিকাফ করেছেন।’

হাদীস থেকে প্রতিপাদন হয় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর তাঁর বিবিগণ ইতিকাফ করতেন। তাই ইতিকাফ করা পুরুষদের জন্যে যেমন নেকীর কাজ, তেমনি মহিলাদের জন্যে পুণ্যের কাজ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য, মহিলারা অবহেলা করে কিংবা ইতিকাফ সংক্রান্ত মাসআলা না জানার কারণে তারা ইতিকাফের ফযীলত থেকে অধিকাংশই বঞ্চিত। তাই মহিলাদের ইতিকাফ সংক্রান্ত কিছু জরুরী মাসআলা নিচে উল্লেখ করা হলো।

মাসআলা : মেয়েরা নিজ ঘরের যে স্থানকে নামাযের জন্যে নির্ধারণ করেছে সেখানেই ইতিকাফ করবে।
মাসআলা : মেয়েদের জন্যে ঘরের কোনো স্থান নামাযের জন্যে নির্ধারিত না থাকলে ঘরের যে কোনো এক রুম বা স্থানকে ইতিকাফের জন্যে নির্দিষ্ট করে নেবে।
মাসআলা: মসজিদে সুব্যবস্থা থাকলে মহিলাদের জন্যে মসজিদে ইতিকাফ করা জায়েয আছে; কিন্তু মসজিদের তুলনায় নিজ ঘরে ইতিকাফ করা মহিলাদের জন্যে অধিক উত্তম। বর্তমান যুগে মসজিদে মহিলাদের ইতিকাফ করা মাকরুহ। আর বেপর্দা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তা হারাম হবে।

মাসআলা : ইতিকাফ করার জন্যে মহিলাদের হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া এবং ইতিকাফের নিয়ত করা শর্ত। আর রমযান মাসে যেহেতু রোযা রাখা হয় তাই ভিন্নভাবে রোযা রাখা শর্ত করা হয়নি। তবে যদি মান্নতের ইতিকাফ হয় তাহলে রোযা রাখাও শর্ত।

মাসআলা: মহিলাদের ইতিকাফের জন্যে স্বামীর অনুমতি নেয়া জরুার। স্বামী একবার অনুমতি দিলে পরে আর নিষেধ করতে পারবে না।

মাসআলা : যে মহিলার স্বামী নেই তার জন্যে নিজ অভিভাবকের পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে ইতিকাফ করা উত্তম।
মাসআলা : যে মহিলার স্বামী, অভিভাবক কেউ নেই তার জন্যে ইতিকাফ করার ক্ষেত্রে কারো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই।
মাসআলা : যে মহিলার স্বামী অসুস্থ এবং তার সেবা করা প্রয়োজন, তার জন্যে ইতিকাফ করার চেয়ে স্বামীর সেবা করা উত্তম। এতে তার আমল নামায় ইতিকাফের তুলনায় অধিক সাওয়াব লেখা হবে।

মাসআলা : যে মহিলার ছোট ছোট ছেলে-সন্তান রয়েছে এবং তাদের লালন-পালন ও দেখা-শোনা করার জন্যে অন্য কোনো লোকও নেই, সে মহিলার জন্যে ইতিকাফ না করে ছেলে-সন্তানের লালন-পালন ও দেখা-শোনা করা উচিত। যেন এ ইতিকাফের কারণে ছেলে-সন্তানের লালন-পালনে কোনো প্রকারের ত্রুটি না আসে।

মাসআলা : যদি কোনো মহিলা স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে ইতিকাফে বসে, পরে কোনো প্রকার ওযর ছাড়াই নিছক তাদের আদেশে ইতিকাফ ছেড়ে দেয় তাহলে সে গুনাহগার হবে। তবে কোনো শরয়ী ওযরের কারণে হলে গুনাহগার হবে না।
মাসআলা: রমাযানের শেষ ১০ দিনের সুন্নাত ইতিকাফে বসার আগে কোনো মহিলার হায়েয বা নেফাস আসার আশঙ্কা থাকলে, তার জন্যে সুন্নাত ইতিকাফের নিয়ত না করে, হায়েয বা নেফাস আসার আগ পর্যন্ত নফল ইতিকাফের নিয়তে ইতিকাফে করতে পারবে।

মাসআলা : কোনো মহিলার ইতিকাফ অবস্থায় হায়েয বা নেফাস শুরু হলে, তা আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই ইতিকাফ ছেড়ে দেবে। পরে ঐ দিনের কাযা আদায় করে নেবে।
কাযা আদায়ের পদ্ধতি : হায়েয-নেফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পরও রমযান মাস বাকি থাকলে, সে ঐ সময় তার কাযা আদায় করতে পারবে। রমযানের রোযাই তার জন্যে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। আর রমযান মাস না হলে ইতিকাফ কাযা করার জন্য রোযা রাখা আবশ্যক।

মাসআলা : যে মহিলার যুবতী মেয়ে আছে এবং তাকে দেখা-শোনার কেউ নেই, এ অবস্থায় তার জন্যে ইতিকাফ করার চেয়ে যুবতী মেয়ের দেখা-শোনা করা উত্তম। কেননা ইতিকাফে বসার কারণে তার দেখা-শোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে, যা শরীয়তে কাম্য নয়।

মাসআলা : ইতিকাফ অবস্থায় মহিলার জন্যে স্বামীর সাথে শয়ন করা এবং সহবাস করা নাজায়েয।
মাসআলা : মাহরামদের কেউ কেউ সাক্ষাত করতে এলে নির্ধারিত জায়গায় থেকে তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারবে।

মাসআলা : কোনো মহিলা রাত্রে একাকী থাকতে ভয় পেলে তার সাথে অন্যরাও থাকতে পারবে। ঘর বড় হোক বা ছোট। তবে শর্ত হলো, সে যেন তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে বের হয়ে না যায়।

যে সব কাজে মহিলাদের ইতিকাফ ভঙ্গ হয় না
———————-
ক. খানা আনার কেউ না থাকলে রান্না ঘর থেকে খানা আনা।
খ. কোনো ওযরের কারণে নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করা। যেমন নির্ধারিত স্থানে বৃষ্টি পড়লে বা সব সময় কোনো কারণে ভয় পেলে তার জন্যে ঘরের অন্য কোনো স্থান নির্বাচন করে সেখানে চলে যাওয়া।

গ. নিজ পরিবার-পরিজনের নিকট মাথা পরিস্কার করার জন্যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাইরে বের করে দেয়া।
ঘ. বাথরুমে আসা-যাওয়ার পথে এদিক সেদিক দেখা এবং না দাঁড়িয়ে গমনাগমনের পথে কারো সাথে কথা বলা।
ঙ. সহবাসের আনুসাঙ্গিক কাজ, যেমন চুমা দেয়া, আলিঙ্গন করা ইত্যাদি ইতিকাফ অবস্থায় করা নাজায়েয। তবে এর কারণে বীর্যপাত না হলে ইতিকাফ ভাঙ্গবে না। এমনিভাবে কেবল চিন্তা-ভাবনার কারণে বীর্যপাত হলে ইতিকাফ ফাসেদ বা বাতিল হবে না।
চ. মহিলাদের জন্যে তাদের নির্ধারিত স্থানে বসে ঘরের কাজ যেমন সেলাই করা, হলুদ-মরিচ পিষা, তরকারী কাটা ইত্যাদি আঞ্জাম দেয়া বৈধ। অনুরূপভাবে নির্ধারিত স্থানে বসে কাউকে কোনো কাজের আদেশ দেয়াও জায়েয। তবে স্থান ত্যাগ করতে পারবে না।

যে সব কারণে মহিলাদের ইতিকাফ ভেঙ্গে যায়
———————–
১. অযুর পূর্বে বা পরে অনিচ্ছায় অযুখানায় বা গোসলখানায় বসে সাবান দিয়ে হাত মুখ পরিষ্কার করলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

২. অযুর পর অযুখানায় বা বাথরুমে দাঁড়িয়ে রুমাল কিংবা অন্য কিছু দিয়ে অযুর পানি মুছলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

৩. বিনা প্রয়োজনে নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করে ঘরের বাইরে বা ঘরের অন্য কোনো স্থানে কোনো বস্তু আনা-নেয়ার জন্যে বা কাউকে কিছু দেয়ার জন্যে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

৪. নির্দিষ্ট স্থান ছেড়ে কারো সাথে সাক্ষাত করতে গেলে কিংবা মেহমানদারী করার জন্যে বের হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

৫. প্রয়োজনীয় কাজ ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সামান্য সময়ের জন্যে বের হলে ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ. এর মত অনুসারে তার ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের পড়ার সুযোগ করে দিন।

Mufti Jonaid Mahmud

প্রত্যেকটা সাফল্যের পেছনে পরিশ্রম রয়েছে। তাই সফলতা খুজার আগে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিৎ।