শবে বরাত বা শাবানের মধ্যরজনী কি! কেনো! কিভাবে! কি করনীয়

শবে বরাত বা শাবানের মধ্যরজনী কি! কেনো! কিভাবে! কি করনীয়

হিজরী বর্ষের ৮ম মাস শাবানের মধ্যরাত তথা ১৪ তারিখ দিনগত রাত—যেটাকে আমরা শবেবরাত হিশেবে জানি, কী তার মাহাত্ম? করণীয়-বর্জণীয়?

শবে বরাত নিয়ে নানান কথা আমাদের মাঝে প্রচলিত। কেউ কেউ এর সাথে নানান বিদআত জুড়ে দেন, কেউ বা আবার একেবারেই অস্বীকার করে বসেন৷ এই বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি বাদ দিয়ে আমাদের উচিত মধ্যপন্থার চর্চা করা৷

“শবে বারাত” দুইটি ফার্সি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, শব অর্থ রাত, আর বারাত অর্থ নাজাত, মুক্তি, পবিত্রতা ইত্যাদি।
“বারাত” শব্দটি ফার্সি হলেও আরবী ভাষায় এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, যেমন—
কুরআনে কারীমে সূরা ক্বামারের ৪৩ নং আয়াতে “বারাত” মুক্তির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
সূরা আহযাবের ৬৯ নং আয়াতে “বারাত” শব্দটি নির্দোষ হওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

বুখারী শরীফে “ﺗﻌﺪﻳﻞ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ ﺑﻌﻀﻬﻦ ﺑﻌﻀﺎ” অধ্যায়ে ২৬৬ নং হাদীসে “বারাত” শব্দটি পবিত্রতা ও মুক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ।
তো যারা আরবী-ফার্সি ভাষার ধারণা রাখেন তারা জানেন যে, প্রায়ই এমন শব্দ পাওয়া যায় যেটা একই রূপে উভয় ভাষায় ব্যবহারে আসে। বারাতটা ঠিক এমনই এক শব্দ। কিন্তু ১৪ তারিখের রাত্রিকে শবে বরাত কেন বলা হয়?
এর উল্লেখ কোথাও আছে কি?

উত্তর হলো এ রাতকে হাদীসে “লাইতুন নিসফি মিন শা’বান” তথা অর্ধ শাবানের রজনী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনায় যা বুঝা যায়, এই রাতে মানুষ সাধারণের তুলনায় রহমত ও মাগফিরাত অধিকহারে পেয়ে থাকে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় এ রাতকে “শবে বরাত” সম্ভোধন করা হয়। নামটি পূর্ববর্তী বিজ্ঞজন আরোপিত। গ্রহনযোগ্য বহু হাদীসে এ রাতে ব্যাপক ভাবে ক্ষমার কথা বলা হয়েছে, আর এদিক লক্ষ্য করেই এ রাতকে মুক্তির রজনী তথা শবে বরাত বলা হয় ।

এ রাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসে কী বলা হয়েছে আমরা তা লক্ষ্য করতে পারি—

হযরত মুআয ইবনউ জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”

এই হাদীস দ্বারা শবে বরাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। আর বোঝা যায়, এই রাতে রহমত ও মাগফিরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয় ।

এই হাসীসটি বর্ণনা করেছেন—
সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদীস-ক্রম : ৫৬৬৫, কিতাবুস সুন্নাহ, ১/৫১২;
শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২; ৫/৩৬০; ৯/২৪;
আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা ৩/১৩৫ হাদীস-ক্রম : ১১৪৪;
আল মু’জামুল কাবীর, ২০/১০৮ সহ আরও কমপক্ষে ১০-১৫ টিরও অধিক হাদীস গ্রন্থে এই হাদীস উল্লেখিত হয়েছে ।

যদি শবে বরাতের ফজিলত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য আর কোনো হাদীস না ই থাকত, তবে এই একটাই যথেষ্ট ছিলো, কিন্তু আমরা দেখতে পাই শবে বরাত নিয়ে আরও অ-নে-ক হাদিস বিদ্যমান ।

আমাদের কিছু ভাইয়েরা এ বিষয়ে ৭ম শাতাব্দীর অন্যতম পুরোধাব্যক্তি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এবং ১৪তম শতাব্দীর বিশিষ্ট শায়খ নাছির উদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহকে অনুসরণ করতে দেখা যায়। শবে বরাত নিয়ে শায়েখ আলবানি তাঁর “সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহায়” উপরোক্ত হাদীস সহ আরও প্রায় সাতটা হাদীস উল্লেখ করতঃ যারা কোনো ধরনের খোঁজখবর ছাড়াই বলে দেয়— ‘শবে বরাতের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস নেই’—তাদের এই উদ্ভট দাবি খণ্ডন করে বলেন, “রিওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই হাদীস নিঃসন্দেহে সহীহ।”
আরবী অংশটুকু এরকম—

ﻭ ﺟﻤﻠﺔ ﺍﻟﻘﻮﻝ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺑﻤﺠﻤﻮﻉ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﻄﺮﻳﻖ ﺻﺤﻴﺢ ﺑﻼ ﺭﻳﺐ

বাংলাদেশের অন্যতম আলেম, হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিত পর্যায়ের ব্যক্তি মুহতারাম আবদুল মালেক সাহেব দামাত বারাকাতুহুম তাঁর এক দরসে এতদঃ সম্পর্কিত আলোচনায় বলেছিলেন, (শেষ অংশ) “আপনাদের প্রতি আমার সর্বশেষ অনুরোধ এই যে, দয়া করে এই রাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. (৭২৮ হি.) এর ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম (৬৩১-৬৪১)
ইমাম ইবনউ রজবের লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৫১-১৫৭ পড়ুন এবং ভেবে দেখুন যে, তাঁদের এই দলিলনির্ভর তাহকীক অনুসরনযোগ্য না শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহর একটি আবেগপ্রসূত মতামত?
যা হয়ত তিনি শবে বরাত নিয়ে কোনো কোনো জাহেল লোকদের বাড়াবাড়ির প্রতিকার হিশেবেই ব্যক্ত করেছেন । তবে এইকথা স্পষ্ট যে, বাড়াবাড়ির প্রতিকার বাস্তব বিষয়কে অস্বীকার করে নয়; বরং তার যথাযথ উপস্থাপনের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।”

(সূত্রঃ
নির্বাচিত প্রবন্ধ-২, মাও. আবদুল মালেক।
শা’বান ও শবে বরাত, মাও. মাহবুবুল হাসান )

এই জায়গায় আমার একটা হালকার উপর ঝাপসা প্রশ্ন জাগে যে, আমাদের ভাইয়েরা দুইপক্ষের মধ্যকার তফাৎটুকু উপলব্ধি করতে পারেন তো!

শবে বরাত সম্পর্কে আরেকটি হাদীস—
এটি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণীত, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ পাক প্রথম আসমানে ‘অবতরণ’ করেন এবং প্রতিটি (মুমিন) বান্দাহকে ক্ষমা করে দেন।”
উল্লেখ এসেছে—
শুআবুল ঈমান ৩/৩৮০; কিতাবুস সুন্নাহ ১/২২২; শরহুস সুন্নাহ ৪/১২৭; আলবানী রাহিমাহুল্লাহর আস সিলসিলাতুস সহীহাহ ৩/১৩৭।

হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও বর্ণিত আছে—
ﺇﺫﺍﻛﺎﻥ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻳﻐﻔﺮﺍﻟﻠﻪ ﻟﻌﺒﺎﺩﻩ ﺇﻟّﺎ ﻟﻤﺸﺮﻙ ﺃﻭ ﻣﺸﺎﺣﻦ .
উল্লেখ করেছেন— মুসনাদে বাযযার- ২৪৫;
মাজমাউয যাওয়াইদ- ৮/৬৫; সিলসিলাতুস সহীহাহ ৩/১৩৭।
এই রাত সম্পর্কে আরও অনেক সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম হতে বর্ণিত হাদীস ও “আছার” বহু প্রামাণ্য গ্রন্থে পাওয়া যায়।

হযরত উমর ইবনু খাত্তাব ও আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সহ অনেক সাহাবীর একটি বিশেষ দুআ যা তাঁরা শবে বরাতে করতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় আল মিরকাত গ্রন্থে (কিতাবুস সালাত, ৩/১৯৭)।

শবে বরাতের আমল কী?
এ সম্পর্কে শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকি ৩/৩৮২, ৫/৩৬২ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়—
“অর্ধ শাবানের রাত্রে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণের তুলনায় দীর্ঘ সাজদাহ সহ দীর্ঘক্ষণ নফল নামাজ পড়েছেন । এবং এই রাতে আল্লাহ পাক ক্ষমা প্রর্থনাকারীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহ প্রর্থীদের অনুগ্রহ করেন।”

এছাড়া মুসান্নাফে ইবনু আবী শায়বা ১০ম খণ্ড; সুনানে ইবনে মাজাহ; মুসনাদে আহমদ ৬ষ্ট খণ্ড; সুনানে তিরমিযী; আলবানি সি.আ.স. ৩য় খণ্ড সহ আরও অনেক গ্রন্থে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ রাতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে জিয়ারত করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই হাদীস নিয়ে দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়, কেউ কেউ কোনো কালাম ছাড়াই মেনে নিয়েছেন, কেউ এর সনদকে দুর্বল বলেছেন, তবে হাদীসকে মাওজু বলে কারও কোনো কথা পাওয়া যায় নি। তাছাড়া এর একাধিক বর্ণনা গ্রহনযোগ্যতার দাবী রাখে।

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনা সুনানে ইবনে মাজায় এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
‘পনেরো শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা তা ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখ। কেননা, এই রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, “কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি?
আমি তাকে ক্ষমা করব ।
আছে কি কোনো রিজিক প্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দেব।”
এভাবে সুবেহ সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তায়াল মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন।’ হাদীস-ক্রম : ১৩৮৪
শোয়াবুল ঈমান ৩য় খণ্ডেও প্রায় সমার্থবোধক হাদীস বর্ণীত হয়েছে, হাঃ নং- ৩৮২২

মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে— “পাঁচটি রাত এমন হয়েছে, যাতে বান্দার কোনো দু’আ ফেরৎ দেয়া হয় না।
এক, জুম’আর রাত ।
দুই, রজব মাসের প্রথম রাত।
তিন, শা’বানের মধ্য রাত।
চার-পাঁচ, দুই ঈদের দুই রাত ।
-হাদীস- ৭৯২৭।

প্রসিদ্ধ ফতোয়া গ্রন্থ “ফতোয়ায়ে আলমগীরী”তে উল্লেখ করা হয়েছে- কবর জিয়ারতের জন্য চারটি দিন সবচেয়ে উত্তম- সোমবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার । …এ ছাড়া বরকতময় রজনীসমূহেও কবর জিয়ারত করা উত্তম। তন্মধ্যে শবে বরাত উল্লেখযোগ্য।
-আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহ, খঃ ৫, পৃঃ ৩৫০ ।

তো এবার কথা হলো লিখলে আরো অনেক হাদীস, সাহাবায়ে কেরামগণের “আছার” তাবিয়ী-তবে তাবিয়ীগণের অনেক অনেক দিক-নির্দেশনা মূলক উক্তি রয়েছে। শুরু থেকে এই অব্দি পক্ষে-বিপক্ষে, দালীলিক-যৌক্তিক, বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি-তুলনামূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ অনেক গুরুগম্ভীর লেখা আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে, আল হামদুলিল্লাহ ।
যেটুকু নিজে বুঝেছি, এবং উলামায়ে উম্মতের অভিমতের আলোকে এই ফজীলত ও বরকতপূর্ণ রজনীতে আমরা চাইলে অনেক পূণ্য অর্জন করতে পারি।
#_যে_কাজ_গুলো আমরা করব তা হলো, যথাসম্ভব একলা, নিরিবিলি আল্লাহকে স্মরণ করব। নফল নামাজ পড়ব বেশি বেশি। জিকির-আযকার করব। আল্লাহর কাছে বেশি থেকে বেশি তাওবা-ইসতিগফার করব। পুরুষরা অত্মীয়-স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে পারেন।
জড়ো হয়ে কোনো আমল করা, মাইকে শবীনা খতম পড়া, মসজিদে ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদিকে আলেম-উলামারা অনুচিৎ বলেছেন। সুতরাং এর থেকে বিরত থেকে আমরা নিজেরা নিজ ঘরে, কোনো নীরব স্থানে ইবাদত করব। পরের দিন রোজা রাখতে পারি, তবে শবে বরাতের “সুন্নত” মনে করে নয়।
যেহুতু ১৫ তারিখ আইয়্যাম বীয, রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। আর শাবানের ১৫ তারিখ বরকতপূর্ণ শাবান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, আর এই কারণদ্বয়কে সামনে রেখে রোযা রাখলে ইনশা-আল্লাহ সে এর প্রতিদান পাবে।

আর হ্যাঁ, লক্ষণীয় হলো শবে বরাতকে কেন্দ্র করে, আতশবাজী করা, হালুয়া-রুটির আয়োজন করা (এ দু’টি কাজ দু’টি ভ্রান্ত আক্বিদার সাথে সংশ্লিষ্ট বলে কোথাও কোথাও পাওয়া যায়) বড় করে খানা-পিনার আসর করা, ইত্যাদি আরো অনেক কাজ করা শুধু নিষেধ নয়, বরং বড় ধরণের গুনাহর কাজও। আল্লাহ পাক আমাদের হেফাজত করুন ।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের পড়ার সুযোগ করে দিন।

Hossain Ahmed

এই লেখক তার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই লিখেননি