মুসাফিরের নামায আদায়ের পদ্ধতি বিস্তারিত জেনে নিন

কেউ যদি নিজ এলাকা থেকে ৪৮ মাইল দূরে যাওয়ার বা সেখানে পৌছে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করে তাহলে সে কসর পড়বে । নিজ এলাকা থেকে বের হওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত । কসর অর্থ হচ্ছে ৪ রাকাআত বিশিষ্ট নামায ২ রাকাআত পড়া । যেমনঃ জোহর, আসর ,ইশার নামায । ২ বা ৩ রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে কসর নেই । যেমনঃ ফজর , মাগরিব এবং বিতর নামায ।

 

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
” যখন তোমরা ভূমিতে সফর করো তখন নামায সংক্ষিপ্ত করতে গুনাহ নেই । যদি আশঙ্কা হয় যে , কাফিররা তোমাদেরকে কষ্ট দিবে । নিশ্চয়ই কাফিররা তোমাদের স্পষ্ট দুশমন ।”
[ সূরা নিসা : ১০১ ]

 

ইয়া’লা ইবনে উমাইয়া বলেন-
” আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ কে জিঙ্গাসা করলাম , ( কুরআনে এসেছে -) যদি কাফিরদের সম্পর্কে তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, তারা তোমাদেরকে কষ্ট দিবে , তাহলে নামায সংক্ষিপ্ত করতে পার ।

এখন তো এই আশঙ্কা নেই ( তাহলে এখনও কি এই বিধান বিদ্যমান রয়েছে ? ) । উমর রাঃ বললেন , এ প্রশ্ন আমারও ছিল । আমি নিজে রসূল্লালাহ (সঃ) এ বিষয়ে জিঙ্গাসা করেছি । তিনি উত্তরে বলেছেন , ‘ এটা তোমাদের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত অবকাশ । অতএব তোমরা তার দান গ্রহন করো ।”
[ সহীহ মুসলিম : ১/২৪১ ]

 

 

সফরের দূরত্ব
…………………..
কি পরিমান দূরত্বে সফর করলে কসর করা যায় – এ প্রশ্নের উত্তর এই যে ,এ বিষয়ক অধিকাংশ রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় ৪৮ মাইল বা তার বেশি দূরত্বে সফরের নিয়ত করলে কসর করা যাবে অন্যথায় করা যাবে না ।
এই রেওয়ায়েত গুলোতে এ প্রসঙ্গে ‘ আরবাআতু বুরুদ ‘ ( ৪ বারীদ) শব্দ এসেছে । আর ১২ মাইলে ১ বারীদ হয়ে থাকে । [ মুখতারুস সিহাহ ] জেনে রাখা ভালো যে , কিলোমিটারের হিসেবে ৪৮ মাইল হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৭৭ কিলোমিটারের সমান ।

 

ইমাম মালেক রহঃ থেকে বর্নিত ,
” আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) সম্পর্কে জেনেছি যে , তিনি মাক্কা ও তায়েফ , মাক্কা ও আসফান এবং মাক্কা ও জিদ্দার সফরে নামায কসর করতেন ।”

 

ইমাম মালিক রহঃ বলেন , এ দূরত্ব হচ্ছে ৪ বারীদ । আমার মতে এটাই হলো কসরের দূরত্ব । তিনি আরও বলেন , ‘ নিজ এলাকার বসতি থেকে বের হওয়ার পর কসর আরম্ভ করবে এবং পুনরায় বসতিতে পৌঁছার পর পূর্ন নামায পড়বে।
[ মুয়াত্তা মালিক : পৃ-৫২ ] উল্লেখ্য , মাক্কা ও জিদ্দার মধ্যবর্তী দূরত্ব হল ৭২ কিলোমিটার । মাক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো ৮৮ কিলোমিটার এবং মাক্কা ও আসফানের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো ৮০ কিলোমিটার ।

 

 

সহীহ বুখারীতে এসেছে-
” আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) ‘ ৪ বারীদ ‘ দূরত্বের সফরে নামায কসর পড়তেন এবং রোযা না রাখার অবকাশ গ্রহন করতেন । ‘ ৪ বারীদ ‘ হলো ‘ ১৬ ফরসখ ‘ । ”

[ সহীহ বুখারী : ১/১৪৭ ] উল্লেখ্য যে , ৩ মাইলে ১ ফরসখ হয় । তাহলে ১৬ ফরসখে ৪৮ মাইল হয় ।

 

অন্য এক বর্ননায় এসেছে-
” আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর কাছে জিঙ্গাসা করা হলো , আরাফার উদ্দেশ্যে মাক্কা ত্যাগ করলে কি পথিমধ্যে নামায কসর করা যাবে ? তিনি উত্তরে বললেন , না , তবে আসফান ও জিদ্দা ইত্যাদি স্থানের উদ্দেশ্যে সফর করলে নামায কসর করা যাবে ।”

 

[ আত-তালখীসুল হাবীব : ২/ ৪৬ ] মুহাদ্দিসিন ও সালাফে সালেহীনদের মতামত
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
প্রসিদ্ধ গায়রে মুকাল্লিদ মুফতী মাওলানা আবু সাঈদ শরফুদ্দীন কসরের দূরত্ব বিষয়ক বিভিন্ন বর্ননা আলোচনার পর ‘ ফাতওয়ায়ে সানাইয়্যা ‘ লিখেন , ‘ সারকথা এই যে, কসরের দূরত্ব ৪৮ মাইল হওয়াই বিশুদ্ধ , ৯ মাইল হওয়া ভুল ।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন,
মুহাদ্দিসিন ও সালাফে সালেহীনদের মত এই যে , ৪৮ মাইল দূরত্বের সফরে নামায কসর করা যাবে, তার কমে নয় ।”

 

[ ফাতওয়ায়ে সানাইয়্যা :১/৪৬২ ] উপরের বর্ননাগুলো থেকে প্রমানিত হয় যে, নিজ এলাকার বসতি অতিক্রম করার পর থেকে কসরের অবকাশ আরম্ভ হয়। কেননা, রসূল্লালাহ (সঃ) যখন মাক্কার উদ্দেশ্যে সফরের ইরাদা করেছেন তখন মদীনার বাইরে যুলহুলায়ফা নামক স্থানে এসে কসর পড়েছেন ।

 

সফরের সময়সীমা
…………………………
সফরে কোনো স্থানে ১৫ দিন বা তার বেশি সময় অবস্থানের নিয়ত করলে পূর্ন নামায পড়তে হবে। আর যদি ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করে তাহলে কসর করতে হবে । যদি এমন হয় যে, সুনির্দিষ্টভাবে কত দিন অবস্হান করতে হবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয় , আর আজ যাব , কাল যাব করতে করতে ১৫ দিনের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে যায় তবুও কসরই পড়তে থাকবে ।

 

রসূল্লালাহ (সঃ) থেকে এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়সীমা বর্নিত হয়েছে। তবে সাহাবায়ে কিরাম যেহেতু এগুলোর প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও অবগত ছিলেন এবং রসূল্লালাহ (সঃ) এর কর্মপদ্ধতি, বিশেষত রসূল্লালাহ (সঃ) এর পবিত্র জীবনের শেষ আমল ছিল সাহাবীদের সামনে তাই তারা যখন এ সময়সীমা ১৫ দিন নির্ধারণ করেন তখন তা সুন্নাহ থেকে আহরিত হওয়ার বিষয়ে কোনই সন্দেহ থাকে না ।

 

আল-মুগনী গ্রন্থে এসেছে-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন , ” যদি তুমি কোন স্থানে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত কর তাহলে পূর্ন নামায আদায় করবে । ”
[ আল-মুগনী, ২য় খন্ড, ২৮৮ পৃষ্ঠা, সলাতুল্ মুসাফির ] হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত –
” যে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত করল সে পূর্ন নামায আদায় করবে । ”
[ জামে তিরমিযী : ১/৭১ ]

Author Details

Hard work can bring a smile on your face.

Related Posts

Post thumbnail
11 months ago

সফর ও কসর সংক্রান্ত জরুরী মাসায়েল জেনে নিন (শেষ পর্ব)

শুধু মাত্র মুক্তাদী মুসাফির হলেঃ মাসআলাঃ ইমাম মুকীম এবং মুক্তাদী মুসাফির হলে সে ইমামের অনুকরনে চার রাকাআতই পড়বে।–আল-মাবসূত ২/৯৪।  ...

Post thumbnail
11 months ago

সফর ও কসর সংক্রান্ত জরুরী মাসায়েল জেনে নিন (পর্ব-১)

মুসাফির কে? যে ব্যক্তি কমপক্ষে ৪৮মাইল(৭৭.২৪৬৪কিলোমিটার)সফর করার নিয়তে নিজ আবাদীর লোকালয় থেকে বের হয়েছে, সে শরীআতের পরিভাষায় মুসাফির হিসেবে গন্য...

Leave a Reply

Comment has been close by Administrator!