‘বিধবা তানিয়া ও জুবাইর’-এর সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী

প্রথম জীবনে জুবাইর মাদ্রাসায় পড়তো; কিন্তু মাদ্রাসা পড়া ওর ভালো লাগে না। অবশেষে স্কুলে ভর্তি হয়। কলেজ থেকে BA/BEd পাশ করে। সে যখন কলেজে পড়তো, তখন থেকে ফাহিমার সাথে প্রেম করে। এখন সে একটি L.P. স্কুলে শিক্ষকতা করে।
.
গত বছর জুবাইর আমার বাড়িতে আসলো। বললো,
– বন্ধু! তোর জানা মত কোনো ভালো মাইয়্যা আছে কি?
– কেন রে?
– বাড়িতে আমার জন্যে কন্যা দেখতেছেন। ভাবলাম নিজেও কিছুটা খোঁজখবর নিয়ে দেখি।
– আচ্ছা এই কথা? তোর ফাহিমার(প্রেমিকার) খবর কী? তাকে বিয়ে করবি না?
– এই দুঃখ আর বলিছ না রে ভাই! তিনবছর প্রেমের পর আমাদের ব্রেক-আপ হয়ে গেছে। এরপর ফাহিমার বিয়েও হয়ে গেছে।
– উফ! আচ্ছা ঠিকাছে, তোর জন্য মেয়ের খোঁজ নেবো। আচ্ছা, মেয়েটা কেমন হতে হবে?
– এই তো শিক্ষিত, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী হতে হবে। আর দ্বীনদার হলে তো আরো ভালো।
– দ্বীনদার? তুই তো নামাজই পড়িছ না। আর দ্বীনদার মেয়ে?
– দূর বন্ধু! বিয়ের পর আমি ঠিক হয়ে যাবো, নামাজ পড়বো। পুরো দ্বীনদার হয়ে যাবো।
– আচ্ছা, তাহলে খোঁজ নেবো এমন একটা মেয়ের।

জুবাইর চলে যাওয়ার পর আমি নিজ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম।
– শিক্ষিত, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও দ্বীনদার; এ’সব গুণে গুণান্নিত কোনো মেয়ে তোমার জানা আছে?
– হ্যাঁ, আছে। আমাদের সপ্তাহিক তালিম জামাতে একটা মেয়ে আসে, নাম ‘তানিয়া’। খুব সুন্দরী, দ্বীনদার, বুদ্ধিমতীও বটে। আর একটা ‘Private Girls School’-এ পড়ায়, অর্থাৎ শিক্ষিতও। কিন্তু মেয়েটা বিধবা। স্বামীর ঘরে মাত্র চার মাস থাকার পর স্বামী মারা যায়। তবে দেখতে বিধবা মনে হয় না, খুব সুন্দরী!
– ঠিকাছে। বিধবা হলেও সমস্যা নেই। জুবাইরকে বলেই দেখিনা সে কী বলে।

পরেরদিন সকালে জুবাইরের কাছে ফোন দিলাম,
– জুবাইর! একটা মেয়ের সন্ধান পেয়েছি। খুব সুন্দরী, দ্বীনদার, বুদ্ধিমতী ও শিক্ষিত। একটা ‘প্রাইভেট গার্ল্স স্কুলে’-র শিক্ষিকা।
– সত্যি? মেয়েটাকে কীভাবে দেখা যাবে? আজকে দেখা যাবে? ফোন নম্বর আছে? যোগাযোগ করা যাবে?
– আরে দুস্ত! অস্থীর হয়ে গেলি কেন? সবকিছু ঠিক হবে। আমার সব কথা তো শুনবি, নাকি?
– আচ্ছা ভাই! বলো কী বলবা।
– মেয়েটার নাম ‘তানিয়া’। ধার্মিক পরিবারের মেয়ে। প্রথমবার বিয়ের মাত্র চার মাস পর স্বামী মারা যায়। এখন ‘তানিয়া’ বাপের বাড়িতে আছে।
– হোয়াট? শেষ পর্যন্ত আমার জন্য বিধবা মেয়ে দেখলি? আর কোনো মেয়ে চোখে লাগলো না? এ’জন্যই তোদের ‘আলেম সমাজ’কে দেখতে পারি না।
– দেখ জুবাইর! তুই তো বলেছিলি মেয়েটা সুন্দরী, শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী, দ্বীনদার হতে হবে; এ’সকল গুণ কিন্তু মেয়েটার মধ্যে আছে। আর মেয়েটা স্বামীর ঘরে মাত্র চার মাস থেকেছে। তোর ভাবি বললো যে, মেয়েটাকে নাকি দেখতে বিধবা মনে হয় না, খুব সুন্দরী। আর ‘বিধবা’ হওয়া তো মেয়েটার দোষ নয়। কী বলিছ? দোষ?
– বিধবা হওয়া ‘দোষ’ নাকি ‘গুণ’ তা দেখে আমার লাভ নেই। আমি প্রথমবার একজন বিধবা মেয়েকে বিয়ে করবো কেন? মাথা নষ্ট নাকি?
– দেখ জুবাইর! মেয়েটা বিধবা। শরিয়তের আলোকে বিধবা হওয়া কোনো দোষ বা গুনাহ নয়। মেয়েটা সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিন্তু তুই? তুই তো ফাহিমার সাথে তিন বছর প্রেমে জড়িত ছিলে। শারিরীক সম্পর্ক করো বা না করো, শরীয়তের আলোকে তুই যিনায় লিপ্ত ছিলে তিন বছর। দোষ বা গুনাহ করলে তুই করেছত। তানিয়া নিষ্পাপ মেয়ে।
– শুনো দুস্ত! আমি তোমার এখানে বিধবা মেয়েকে বিয়ে করতে আসি নাই। এতো পছন্দ হলে তানিয়াকে তুমিই বিয়ে করে ফেলো। ফোন রাখলাম। সালাম…

একমাস পর…
ক্রিং ক্রিং, ক্রিং ক্রিং…
– আস্সালামু আলাইকুম। কে আপনি?
– আমি জুবাইর বলছি। আগামী রবিবারে আমার বিয়ে।
– আলহামদুলিল্লাহ্। কার সাথে বিয়ে?
– সম্পদশালী এক ব্যক্তির মেয়ে ‘প্রিয়াঙ্কা’। চিনবে না তুমি। ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
– আচ্ছা। প্রিয়াঙ্কার বাবার নাম কি ‘জহির’?
– হ্যাঁ দুস্ত। তুই চিনলি কেমনে?
– আমার এক ক্লাসমেটের বাড়ি প্রিয়াঙ্কাদের গ্রামে। ক্লাসমেটের মুখ থেকে ওর গ্রামের একটা মেয়ের কথা শুনেছি। নাম ‘প্রিয়াঙ্কা’। আমার ক্লাসমেট আলেম হওয়ায় ক্লাসমেটের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতো প্রিয়াঙ্কা। সেই প্রসঙ্গে ক্লাসমেটের মুখ থেকে প্রিয়াঙ্কার কাহিনি শুনি। প্রিয়াঙ্কা নাকি ক্লাস নবম থেকেই একটা ছেলের সাথে প্রেম করে আসছে। ক্লাসমেটের মতে, প্রিয়াঙ্কা প্রেমের সাথে সাথে দৈহিক সম্পর্কও করেছে। আমি অবাক! একটা বিধবা ভালো মেয়েকে বিয়ে না করে, তুই প্রিয়াঙ্কার মত একটা মেয়েকে বিয়ে করবে? প্রিয়াঙ্কার নামটাই তো বিধর্মী নাম।
– শুনো দুস্ত! আজকাল ভালো মেয়ে পাওয়া খুব মশকিল। তানিয়া বিধবা, এটা সবাই জানে। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা কার সাথে প্রেম করেছে বা কার সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছে, তা অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত কেউ জানে না। আমি নিজেও এ’বিষয়ে জানার চেষ্টা করিনি বা জানার প্রয়োজন মনে করি না।
– আচ্ছা জুবাইর! ঠিকাছে। যে যেমন সে তেমনই পায়। ভালো থাকিস। পারলে বিয়েতে আসবো। এবার ফোন রাখ…

আল্লাহ তা’য়ালা কোরাআন পাকে ইরশাদ করেন যে, “অপবিত্রা নারিগণ অপবিত্র পুরুষগণের জন্যে এবং অপবিত্র পুরুষগণ অপবিত্রা নারিগণের জন্যে। পবিত্রা নারিগণ পবিত্র পুরুষগণের জন্যে এবং পবিত্র পুরুষগণ পবিত্রা নারিগণের জন্যে।”
(সূরা নূর – ২৬)

পাঠকগণ! কোরআনের ভাষ্যমতে, জুবাইর একজন অপবিত্র পুরুষ, তাই আল্লাহ তাঁকে অপবিত্রা একজন নারী ‘প্রিয়াঙ্কা’ মিলিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে ‘তানিয়া’ একজন পবিত্রা নারী, আল্লাহ তাঁকে অপবিত্র পুরুষ(জুবাইর) থেকে হেফাজত করেছেন। কোরআনের ভাষ্যমতে, পবিত্রা তানিয়ার জীবনে কোনো পুরুষ আসলে পবিত্র পুরুষই আসবে।

মাত্র দু’মাস পর হঠাৎ জুবাইরের ফোন,
– হ্যালো, আমি জুবাইর বলছি।
– অহ, কেমন কাটছে দিন-কাল?
– ভালো না দুস্ত! গতকাল প্রিয়াঙ্কাকে ডিভোর্স দিয়ে দিছি!
– কেন? কী হয়েছিল?
– প্রিয়াঙ্কা প্রায় সময় ওর আগের প্রেমিকের সাথে ফোনালাপ করে। অনেকবার বাধা দিয়েছি কিন্তু কে শুনে কার কথা। গতকালকে প্রিয়াঙ্কাকে ফোনালাপে দেখে সাথে সাথে বকাবকি শুরু করি। এরপর ডিভোর্সের হুমকি দিলে সে বলে, “দিয়ে দাও ডিভোর্স, আমার জন্য ছেলের অভাব হবে না।” তখন ডিভোর্স দিয়ে দিছি। সাথে সাথেই প্রিয়াঙ্কা একাই চলে গেছে নিজ বাড়িতে।
– ইন্নালিল্লাহ্! আগেই তোকে বলেছিলাম কিন্তু তুই শুনলি না আমার কথা। থাক, দুশ্চিন্তা করিছ না। ভাগ্যে যা আছে তা হবেই।
– জি ভাই! এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, আম্মু বলছেন সপ্তাহের ভিতরেই নাকি আমার জন্যে মেয়ে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করতে চান। আম্মুকে ‘তানিয়া’র কথা বলেছি।
– আচ্ছা ঠিকাছে। কালকে রবিবার। আমাদের বাড়িতে মহিলাদের সপ্তাহিক তা’লিম জামাত। তানিয়া অবশ্যই আসবে। আমার স্ত্রীকে বলবো এ’বিষয়ে তানিয়ার সাথে আলোচনা করতে। এরপর জানাবো।

রবিবার রাতে ফ্রী হয়ে জুবাইরের কাছে ফোন দিলাম,
– আস্সালামু আলাইকুম। জুবাইর! কেমন আছো?
– ওয়ালাইকুমুস্সালাম। ভালো আছি। খবর কী?
– খবর ভালো না দুস্ত। আমার স্ত্রী তানিয়ার সাথে এ’বিষয়ে আলোচনা করেছিল। তানিয়া বললো যে, গত সপ্তাহে এক মুফতির সাথে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী মাসের প্রথম রবিবারে তানিয়ার বিয়ে।
– আচ্ছা ঠিকাছে। আমার কপালটাই খারাপ। জীবনে অনেক পাপ করেছি, তাই হয়তো আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন।
– জুবাইর! দুশ্চিন্তা করো না। নিজে ঠিক হয়ে যাও। পাপ কাজ ছেড়ে দাও। নেক কাজে লেগে যাও। আল্লাহর কাছে দোয়া করো। সব ঠিক হবে। তানিয়াকে না পেলেও তানিয়ার মত অন্য কোনো ভালো মেয়ে পেয়ে যাবে।
– ঠিক আছে ভাই! আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি ঠিক হয়ে যাবো। ইসলামী কিছু বই দিবেন, যেগুলো পড়ে আমি দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানার্জন করতে পারবো। আপনার কথামত চলবো। আর আপনি দোয়া করবেন।

প্রিয় পাঠকগণ! আবারও কোরআনের সেই আয়াতের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ বলেছিলেন যে, “পবিত্রা নারীগণের জন্য পবিত্র পুরুষ।” তানিয়া একজন পবিত্রা নারী। আল্লাহ তাঁকে একজন পবিত্র পুরুষ মিলিয়ে দিয়েছেন। শুধু পবিত্র পুরুষই নয়, একজন আলেম, একজন মুফতিকে নিজ স্বামী হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তানিয়ার।

পরের মাসে তানিয়ার বিয়ে মুফতি সাহেবের সাথে সুন্নতী তারিক্বায় হয়ে যায়। অনেকের মুখ থেকে শোনা কথা এই যে, বিয়ের পর থেকে তানিয়া ও মুফতি সাহেবের জীবন খুব সুন্দরে কাটতে থাকে। মুফতি সাহেবের অনুমতি নিয়ে তানিয়া একদিন আমার স্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করে। আমি নিজেই স্ত্রীকে নিয়ে তানিয়ার স্বামীর বাড়িতে যাই। মুফতি সাহেবের সাথে পরিচিতির পর অনেক কথা হয়। সত্যিই অনেক ভালো মানুষ। এতো সুন্দর জ্ঞানী একজন মুফতি সাহেব বিধবা তানিয়াকে পেয়েও সে কী খুশি! আসলে বিধবা হওয়া কোনো দোষ নয়, কোনো গোনাহ নয়; তা মুফতি সাহেব ভালোই জানতেন। তাঁদের সংসার এভাবেই ‘সোনালী সংসার’র মত এগোতে থাকে।

কিছুদিন পর জুবাইর আমার বাড়িতে আসলো। আমি তো আশ্চর্য! জুবাইর হঠাৎ দাঁড়ি রাখলো কবে? আমি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ হুজুর হুজুর ভাব কেমনে?
উত্তরে সে বলে, তিনদিনের তাবলীগে গিয়েছিল। তাবলীগে যাওয়ার পর একজন ভালো আলেমের উসিলায় সে দ্রুত চেইঞ্জ হতে সক্ষম হয়, আল্লাহ তাঁকে সঠিক পথে চলার তাওফিক্ব দেন। জিজ্ঞেস করলাম,
– জুবাইর! তাহলে খবর কী?
– আলহামদুলিল্লাহ! আগামী শুক্রবারে আমার বিয়ে। আপনাকে দাওয়াত দিতে আসলাম।
– কোথায় বিয়ে? কার সাথে?
– তাবলীগের আমির সাহেব সবকিছু ব্যবস্থা করেছেন। উনারই ভাতিজ্বী। আম্মুকে সাথে নিয়ে মেয়েটাকে দেখে এসেছি। হাফেজা, দ্বীনদার, সুন্দরীও অনেক। অবশ্য সেও একজন বিধবা। তবে এতে সমস্যা নেই। একজন হাফেজা, দ্বীনদার মেয়ে, তার উপর সুন্দরী অনেক। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। আসলে সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আলহামদুলিল্লাহ্!
– সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ্! দ্বীনের পথে আসলে আল্লাহই ব্যবস্থা করে দেন। দোয়া করি তোমাদের বিয়ে যেন আল্লাহ ক্ববুল করেন। ভবিষ্যত জীবন যেন সুন্দর ও আনন্দময় হয়। আমীন!

বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখে সেই হাফেজা মেয়ের সাথে জুবাইরের বিয়ে হয়ে যায়। এরপর থেকে জুবাইরের চলা-ফিরা, আমল-আখলাখ্ব দেখলে ঈর্ষা হয়। সে এখন আগের জুবাইর নয়, তাবলীগী সাথি ভাই সে। এদিকে জুবাইরের স্ত্রী জুবাইরকে হাফেজ বানানোর প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ববুল করেছেন।

প্রিয় পাঠকগণ! আপনারা পুরো গল্পটা পড়ে থাকলে বুঝতে পেরেছেন কাহিনিটা। মূল কথা এটাই যে, নিজে যেমন তেমনই জীবনসঙ্গী পাবেন। নিজে পবিত্র হলে পবিত্র সঙ্গী পাবেন। নিজে অপবিত্র হলে অপবিত্র সঙ্গী পাবেন। বিধবা কোনো দোষ নয়, কোনো গুনাহ নয়; বরং প্রেম ও বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কই হল যিনা, পাপ। তানিয়া ভালো ছিল, ভালো সঙ্গী পেয়েছে। জুবাইর ভালো হওয়ায় আল্লাহ তাকেঁ হাফেজা মিলিয়ে দিয়েছেন। পথভ্রষ্ট প্রিয়াঙ্কা পথভ্রষ্টই রয়ে গেল। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এই কাহিনি থেকে কিছু শিক্ষা পাওয়ার এবং সঠিক বোঝার তাওফিক দান করেন। আমীন

Author Details

Hard work can bring a smile on your face.

Related Posts

Leave a Reply

Comment has been close by Administrator!